পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির গোলকধাঁধাসদৃশ লবণের গুহা এবং পান্না রঙের ম্যানগ্রোভ বনের নিচে এক ভিন্ন ধরনের স্থাপত্য সমাহিত হয়ে আছে। এক সময় পর্যটকরা এই ‘উন্মুক্ত ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’ দেখতে ভিড় করতেন এর পরাবাস্তব শিলা গঠন দেখার জন্য; কিন্তু বিশ্বের নজর এখন প্রবাল প্রাচীরের নিচের সেই অংশের দিকে, যা ইরানের ‘মাটির নিচের ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’ হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কেশম দ্বীপটি এক সময়ের মুক্ত বাণিজ্য ও পর্যটন স্বর্গ থেকে যুদ্ধের সামনের সারির দুর্গে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করা মার্কিন নৌ–সেনাদের কাছে এটি এখন কৌশলগতভাবে মূল্যবান এক দ্বীপ। প্রায় ১,৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল দ্বীপটি পারস্য উপসাগর থেকে প্রণালির প্রবেশপথকে ভৌগোলিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথে দ্বীপটি যেন একটি ‘ছিপি’র মতো কাজ করে।
দ্বীপটির ১ লাখ ৪৮ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম, যারা স্বতন্ত্র ‘বান্দারি’ উপভাষায় কথা বলেন। তাদের জীবন আজও এই প্রাচীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আধুনিক সামরিক উত্তেজনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আজও তাদের জীবন সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রতি বছর ‘নওরোজ সায়্যদি’ বা জেলেদের নববর্ষের সময় উদযাপন করা হয়। সমুদ্রের প্রতি সম্মান জানাতে সেদিন সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।
কিন্তু গত ৭ মার্চ যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন বিমান হামলায় দ্বীপটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লোনা পানি শোধনাগার ধ্বংস হয়ে যায়। তেহরান একে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘চরম অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে। ওই হামলার ফলে আশেপাশের ৩০টি গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর দ্রুত প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) বাহরাইনের মার্কিন ‘জুফায়ার’ ঘাঁটিতে হামলা চালায়। তাদের দাবি, প্রতিবেশী কোনো উপসাগরীয় দেশ থেকেই কেশম দ্বীপে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালির ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’ : ১৯৮৯ সাল থেকে একটি মুক্ত বাণিজ্য ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে কেশম দ্বীপটির আধুনিক শিল্প কাঠামোর ওপর ছায়া ফেলেছে ইরানের ‘অজেয় বিমানবাহী রণতরী’ হিসেবে এর বর্তমান ভূমিকা। বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপটি ক্ল্যারেন্স স্ট্রেইট বা ‘কুরান’ এলাকাকে শাসন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এটিই ইরানের ‘অসম’ নৌ–শক্তির প্রধান কেন্দ্র। এই দ্বীপের ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধায় কতগুলো দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট বা উপকূলীয় ব্যাটারি লুকানো আছে তা অত্যন্ত গোপনীয় হলেও তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সামরিক বিশেষজ্ঞ হাসান জৌনি সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে জানান, কেশম দ্বীপের মাটির নিচে বিশাল এক ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’তে ইরানের ‘ভয়াবহ আঘাত হানার সক্ষমতা’ রয়েছে। জৌনি বলেন, এই বিশাল নেটওয়ার্কের একটিই মূল লক্ষ্য, হরমুজ প্রণালিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করে দেওয়া। বাস্তবে গত সপ্তাহে তারা এটি সফলভাবে করেছে। ইরান যখন জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি দেয়, তখন থেকেই এই প্রণালি দিয়ে চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বহু নামের এক দ্বীপ : আরবিতে এই দ্বীপটি ‘জাজিরা–আল–তাউয়িলা’ (লম্বা দ্বীপ) নামে পরিচিত। এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা অনুসারে, গ্রিক অভিযাত্রী নিয়ার্কাস একে ‘ওয়ারাকটা’ নামে উল্লেখ করেছিলেন এবং সেখানে কিংবদন্তি এরিথ্রাসের সমাধি দেখেছিলেন।
নবম শতাব্দীতে ইসলামি ভূগোলবিদরা একে ‘আবারকাওয়ান’ বলতেন, যা পরবর্তীতে লোকমুখে ‘জাজিরা–ই–গাভান’ নামে পরিচিতি পায়।
এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তাতারদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ১৩০১ সালে হরমুজের শাসকরা তাদের পুরো রাজদরবার এই দ্বীপে সরিয়ে এনেছিলেন। বহু শতাব্দী ধরে এটি এই অঞ্চলের ‘পানির পিপা’ হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৫৫২ সালে অটোমান সেনাপতি পিরি রেইস দ্বীপটি জয় করে বিপুল সম্পদ দখল করেছিলেন, যাকে তৎকালীন বর্ণনা অনুযায়ী ‘বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পুরস্কার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।
আগুনের মুখে এক জাদুঘর : সামরিক গুরুত্বের বাইরেও কেশম দ্বীপটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা। এখানে রয়েছে বিরল ‘হারা’ ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘কেশম জিওপার্ক’, যা ২০০৬ সালে এই গৌরব অর্জন করে।